আকিকা করার সঠিক নিয়ম: আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো দম্পতিকে সন্তান দান করেন, তখন তাদের খুশির সীমা থাকে না। এই খুশির শুকরিয়া আদায় করা এবং সন্তানের মঙ্গলের জন্য ইসলামে ‘আকিকা’ করার বিধান রয়েছে। কিন্তু আমাদের সমাজে অনেকেই আকিকা করার সঠিক নিয়ম সম্পর্কে পুরোপুরি জানেন না। কেউ কেউ মনে করেন আকিকা শুধু মাংস খাওয়ার অনুষ্ঠান, আবার কেউ কেউ নির্দিষ্ট সময়ের পরে আকিকা করা যাবে কি না—তা নিয়ে দ্বন্দ্বে ভোগেন।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
“প্রতিটি শিশু তার আকিকার বিনিময়ে আটক থাকে। সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে পশু জবাই করতে হয়, নাম রাখতে হয় এবং মাথা মুণ্ডন করতে হয়।” (রেফারেন্স: সুনানে তিরমিজি: ১৫২২)
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আকিকা করার সঠিক নিয়ম, পশু নির্বাচনের শর্ত এবং মাংস বন্টনের পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
আকিকা কী এবং কেন করা হয়?
সহজ কথায়, নবজাতক শিশুর জন্মের শুকরিয়া হিসেবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যে পশু জবাই করা হয়, তাকে আকিকা বলে। এটি করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা (গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত)।
আকিকা কেন জরুরি? ১. এটি সন্তানের বালা-মুসিবত ও বিপদ দূর করে। ২. শয়তানের অনিষ্ট থেকে শিশুকে রক্ষা করে। ৩. আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের উসিলা হয়।
আকিকা করার সঠিক সময় কখন?
ইসলামি শরিয়ত মতে আকিকা করার সর্বোত্তম সময় হলো শিশুর জন্মের সপ্তম দিন। সপ্তম দিন কীভাবে হিসাব করবেন? যেই বারে শিশু জন্মাবে, তার পরের সপ্তাহের ঠিক আগের বার। (যেমন: শুক্রবার জন্মালে পরবর্তী বৃহস্পতিবার ৭ম দিন)।
হাদিসে তিনটি সময়ের কথা উল্লেখ আছে:
- ১ম অগ্রাধিকার: ৭ম দিন।
- ২য় অগ্রাধিকার: ১৪তম দিন (যদি ৭ম দিনে সম্ভব না হয়)।
- ৩য় অগ্রাধিকার: ২১তম দিন।
নোট: যদি কোনো কারণে এই দিনগুলোতে আকিকা করা না যায়, তবে পরবর্তীতে জীবনের যেকোনো সময় তা আদায় করা যাবে। এমনকি বয়স্ক ব্যক্তি নিজেও নিজের আকিকা করতে পারেন।
ছেলে ও মেয়ের আকিকার নিয়ম: কয়টি পশু?
এখানে ছেলে এবং মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে পশুর সংখ্যায় ভিন্নতা রয়েছে। আকিকা করার সঠিক নিয়ম অনুযায়ী:
- ছেলে সন্তানের জন্য: ২টি ছাগল বা ভেড়া। (সামর্থ্য না থাকলে ১টিও জায়েজ আছে)।
- মেয়ে সন্তানের জন্য: ১টি ছাগল বা ভেড়া।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর নাতি হাসান ও হোসাইন (রাঃ)-এর পক্ষ থেকে দুটি করে দুম্বা আকিকা করেছিলেন। তাই সামর্থ্য থাকলে ছেলেদের জন্য দুটি দেওয়াই উত্তম।
আকিকার পশুর শর্তাবলী
কোরবানির পশুর জন্য যেসব শর্ত প্রযোজ্য, আকিকার পশুর ক্ষেত্রেও একই শর্ত প্রযোজ্য। ১. সুস্থতা: পশুটি সুস্থ, সবল এবং নিখুঁত হতে হবে। অন্ধ, ল্যাংড়া বা রুগ্ন পশু দিয়ে আকিকা হবে না। ২. বয়স: ছাগল বা ভেড়ার বয়স কমপক্ষে ১ বছর হতে হবে (দুম্বা ৬ মাস হলেও চলে যদি হৃষ্টপুষ্ট হয়)। গরুর বয়স কমপক্ষে ২ বছর হতে হবে।
গরু দিয়ে কি আকিকা হবে? অধিকাংশ আলেমদের মতে, ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দিয়ে আকিকা করা উত্তম। তবে কেউ চাইলে গরু বা উটের সাত ভাগের এক ভাগ বা দুই ভাগ আকিকা হিসেবে দিতে পারেন। কোরবানি এবং আকিকা একসাথে করাও জায়েজ।
আকিকার মাংস বন্টনের নিয়ম
আকিকার মাংস বন্টন নিয়ে সমাজে অনেক ভুল ধারণা আছে। অনেকেই মনে করেন বাবা-মা বা নানি-দাদি এই মাংস খেতে পারবেন না। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
সঠিক নিয়ম হলো: আকিকার মাংসকে তিন ভাগ করা মোস্তাহাব (উত্তম), তবে জরুরি নয়: ১. এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য। ২. এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য। ৩. এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য।
মনে রাখবেন: আকিকার মাংস সন্তানের বাবা-মা, ভাই-বোন, দাদা-দাদি সহ সবাই খেতে পারবেন। এটি রান্না করে আত্মীয়দের দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানোও জায়েজ।
আকিকার দোয়া
পশু জবাই করার সময় নির্দিষ্ট দোয়া পড়া সুন্নত। দোয়াটি হলো:
“বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা, হাজিহি আকিকাতু [শিশুর নাম]…” (অর্থ: আল্লাহর নামে, আল্লাহ মহান। হে আল্লাহ, এটি তোমার পক্ষ থেকে এবং তোমারই জন্য। এটি [অমুকের] আকিকা।)
যদি আরবি দোয়া না পারেন, তবে মনে মনে নিয়ত করে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে জবাই করলেই আকিকা আদায় হয়ে যাবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: আকিকার মাংস কি হিন্দু বা অমুসলিমদের দেওয়া যাবে? উত্তর: হ্যাঁ, আকিকার মাংস অমুসলিম প্রতিবেশী বা গরিবদের দেওয়া জায়েজ। এতে ইসলামের উদারতা প্রকাশ পায়।
প্রশ্ন ২: আকিকা না দিলে কি গুনাহ হবে? উত্তর: আকিকা করা সুন্নত, ফরজ বা ওয়াজিব নয়। তাই সামর্থ্য না থাকলে আকিকা না করলে গুনাহ হবে না। তবে সামর্থ্য থাকার পরও অবহেলা করা উচিত নয়।
প্রশ্ন ৩: মৃত বাচ্চার কি আকিকা করতে হয়? উত্তর: যদি বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মারা যায়, তবে তার আকিকা করা সুন্নত এবং তার নাম রাখা উচিত। এতে পরকালে সে বাবা-মায়ের জন্য সুপারিশকারী হবে।
সন্তান আল্লাহর আমানত। আকিকা করার সঠিক নিয়ম মেনে এই আমানতের হক আদায় করা প্রতিটি অভিভাবকের দায়িত্ব। এটি শুধু মাংস খাওয়ার উৎসব নয়, বরং এটি সন্তানের জীবনের নিরাপত্তার একটি আধ্যাত্মিক বর্ম।
আপনি যদি নবজাতকের নাম এখনো ঠিক না করে থাকেন, তবে আমাদের সাহাবী ও কুরআনিক নাম বিভাগ থেকে সুন্দর একটি নাম বেছে নিতে পারেন।

![বাচ্চাদের বদনজর (কুনজর) থেকে বাঁচার কার্যকর দোয়া ও আমল [সহীহ হাদিস]](https://islaminaamkosh.com/wp-content/uploads/2026/02/বাচ্চাদের-বদনজর-থেকে-বাঁচার-দোয়া.jpg)

2 thoughts on “আকিকা করার সঠিক নিয়ম: সময়, পশু ও মাংস বন্টনের বিধান (পূর্ণাঙ্গ গাইড)”