শিশু জন্মানোর পর থেকেই নতুন মায়েদের দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না। কখন শিশুকে গোসল করানো হবে, কখন তেল মাখানো যাবে—এমন হাজারো প্রশ্নের ভিড়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—নবজাতকের নখ ও চুল কাটা আসলে কত দিন বয়সে করা উচিত?
অনেকেই জন্মের পরপরই শিশুর চুল ফেলে দিতে চান, আবার অনেকে ভয়ে নখ কাটতে চান না। কিন্তু সঠিক সময়ে এই পরিচ্ছন্নতা না হলে শিশুর ইনফেকশন হতে পারে। আবার ভুল সময়ে চুল কাটলে শিশুর ঠান্ডা লেগে যাওয়ার ভয় থাকে।
আমাদের প্যারেন্টিং ও আকিকা বিভাগে আজ আমরা নবজাতকের চুল ও নখ কাটার সঠিক সময়, নিয়ম এবং সতর্কতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
নবজাতকের চুল কখন ফেলা উচিত?
আমাদের সমাজে প্রচলিত ধারণা হলো, জন্মের পরপরই শিশুর চুল ফেলে দিতে হবে। অনেকেই মনে করেন, মায়ের গর্ভে থাকাকালে চুলে যে আঠালো পদার্থ লেগে থাকে তা অপরিচ্ছন্ন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, বিষয়টি ভিন্ন।
১. জন্মের পরপরই কি চুল ফেলা জরুরি? না, জরুরি নয়। গর্ভাবস্থায় শিশুর গায়ে ও চুলে যে আঠালো সাদা পদার্থ থাকে, তা আসলে শিশুকে বাইরের বিরূপ আবহাওয়া থেকে রক্ষা করে। এটি নবজাতকের দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। তাই জন্মের সাথে সাথে চুল চেঁছে ফেললে বাচ্চার ঠান্ডা লেগে হাইপোথার্মিয়া (শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়া) হতে পারে।
২. সঠিক সময় কোনটি?
-
ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি: শিশু সুস্থ থাকলে জন্মের ৭ম দিনে চুল ফেলা সুন্নাত।
-
চিকিৎসা পরামর্শ: যদি আবহাওয়া খুব ঠান্ডা থাকে বা শিশু দুর্বল হয়, তবে তাড়াহুড়ো না করাই ভালো। শিশু একটু স্থিতিশীল হলে ১০-১৫ দিন পর চুল ফেলা যেতে পারে।
-
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, শিশুর তিন মাস বয়সের কাছাকাছি সময়ে চুল কাটানো সবচেয়ে নিরাপদ। কারণ এই সময়ে শিশুর ঘাড় শক্ত হয় এবং সে বাইরের আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নিতে পারে।
চুল কাটার সময় যেসব সতর্কতা মানতে হবে
নবজাতকের মাথার ত্বক এবং হাড় খুবই নাজুক থাকে। তাই চুল কাটার সময় নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি:
-
নরম তালু (Soft Spot): জন্মের পর থেকে এক-দেড় বছর পর্যন্ত শিশুর মাথার তালু খুব নরম থাকে। চুল কাটার সময় যেন তালুতে কোনোভাবেই চাপ না পড়ে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
-
জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি: যে ব্লেড বা যন্ত্র দিয়ে চুল কাটা হবে, তা অবশ্যই নতুন এবং জীবাণুমুক্ত হতে হবে। ইনফেকশন এড়াতে অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে চুল কাটানোই বুদ্ধিমানের কাজ।
-
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: চুল কাটার পর শিশুকে কুসুম গরম পানি দিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করে দিতে হবে, যেন কাটা চুলগুলো গায়ে লেগে শিশুর অস্বস্তি বা চুলকানি না হয়।
একটি ভুল ধারণা: বারবার চুল কাটলে কি চুল ঘন হয়?
এটি একটি বহুল প্রচলিত মিথ বা ভুল ধারণা। অনেকেই মনে করেন, বারবার ন্যাড়া করলে বাচ্চার চুল ঘন ও কালো হবে।
প্রকৃত সত্য হলো: শিশুর চুল ঘন হওয়া বা পাতলা হওয়া নির্ভর করে তার চুলের ত্বকের ফলিকলের (Hair Follicle) ওপর। এটি সম্পূর্ণ জন্মগত ও বংশগত বৈশিষ্ট্য। বারবার চুল কাটলে চুলের গোড়া মোটা মনে হতে পারে, কিন্তু নতুন চুল গজায় না। শিশুর চুলের স্বাস্থ্যের জন্য তাকে পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করাই আসল কাজ।
নবজাতকের নখ কাটা কেন জরুরি?
চুলের চেয়ে নখ কাটা বেশি জরুরি। কারণ নবজাতকের নখ খুব দ্রুত বাড়ে এবং নমনীয় হলেও বেশ ধারালো হয়।
কেন নিয়মিত নখ কাটবেন? ১. নিজেদের আঁচড় দেওয়া: শিশুরা হাত নাড়াচাড়া করার সময় নিজেদের নখ দিয়ে নিজেদের মুখ বা চোখে আঁচড় দিয়ে ফেলতে পারে। ২. জীবাণুর সংক্রমণ: নখের ভেতরে ধুলাবালি ও রোগজীবাণু জমে থাকে। শিশুরা স্বভাবতই আঙুল মুখে দেয়। ফলে এই জীবাণু পেটে গিয়ে ডায়রিয়া বা অন্যান্য রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
নখ কাটার সঠিক সময় ও নিয়ম
নবজাতকের নখ কাটার জন্য সঠিক সময় এবং পদ্ধতি জানা থাকলে কাজটি খুব সহজ হয়ে যায়।
কখন কাটবেন?
-
হাতের নখ: হাতের নখ দ্রুত বাড়ে, তাই সপ্তাহে একবার কাটা উচিত।
-
পায়ের নখ: পায়ের নখ ধীরগতিতে বাড়ে, তাই মাসে একবার কাটলেই চলে।
-
তবে যখনই দেখবেন নখ বড় হয়েছে বা ধারালো হয়েছে, তখনই তা কেটে ফেলা উচিত।
সবচেয়ে উপযুক্ত সময়: শিশু যখন গভীর ঘুমে থাকে, তখনই নখ কাটার সেরা সময়। জেগে থাকা অবস্থায় শিশুরা প্রচুর নড়াচড়া করে, ফলে ত্বক কেটে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
নখ কাটার সঠিক পদ্ধতি: ১. পর্যাপ্ত আলো: অন্ধকার বা কম আলোতে নখ কাটবেন না। পর্যাপ্ত আলোতে বসে নখ কাটুন। ২. ভিজিয়ে নেওয়া: কাটার আগে শিশুর আঙুলগুলো হালকা গরম পানিতে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখলে নখ নরম হয় এবং কাটতে সুবিধা হয়। ৩. সতর্কতা: শুধুমাত্র নখের সাদা অংশটুকু কাটুন। চামড়ার খুব কাছাকাছি কাটবেন না। ৪. যন্ত্রপাতি: বড়দের নেইল কাটার ব্যবহার না করে শিশুদের জন্য তৈরি বিশেষ নেইল ক্লিপার ব্যবহার করুন।
নবজাতকের যত্ন নেওয়া একটি নিপুণ শিল্পের মতো। নবজাতকের নখ ও চুল কাটা নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তা না করে ওপরের নিয়মগুলো মেনে চললে আপনার সোনামণি থাকবে সুস্থ ও নিরাপদ। মনে রাখবেন, পরিচ্ছন্নতাই সুস্বাস্থ্যের মূল চাবিকাঠি।
আপনার শিশুর সুন্দর নাম নির্বাচনের জন্য আমাদের সাহাবী ও কুরআনিক নাম বিভাগটি ভিজিট করতে পারেন।

![বাচ্চাদের বদনজর (কুনজর) থেকে বাঁচার কার্যকর দোয়া ও আমল [সহীহ হাদিস]](https://islaminaamkosh.com/wp-content/uploads/2026/02/বাচ্চাদের-বদনজর-থেকে-বাঁচার-দোয়া.jpg)
