শিশুর বদনজর (নজর লাগা) থেকে বাঁচার আমল ও সহীহ দোয়া [আরবি ও বাংলা]

শিশুর বদনজর থেকে বাঁচার দোয়া: ফুটফুটে সুন্দর হাসিখুশি বাচ্চাটি হঠাৎ করেই অকারণে কান্না শুরু করেছে, দুধ খেতে চাইছে না কিংবা হঠাৎ জ্বর চলে এসেছে—ডাক্তারি পরীক্ষায় কোনো সমস্যা ধরা পড়ছে না। এমন পরিস্থিতিতে অনেক অভিজ্ঞ মুরুব্বি বলেন, “বাচ্চাটাকে নজর দিয়েছে কেউ।”

শিশুর বদনজর থেকে বাঁচার দোয়া

আধুনিক যুগে অনেকে এটিকে কুসংস্কার মনে করলেও ইসলামে বদনজর বা ‘নজর লাগা’ (Evil Eye) একটি স্বীকৃত সত্য। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজের নাতি হাসান ও হোসাইন (রাঃ)-কে বদনজর থেকে বাঁচাতে নিয়মিত দোয়া পড়ে ফুঁ দিতেন। আপনি কি আপনার সোনামণির সুরক্ষার জন্য শিশুর বদনজর থেকে বাঁচার দোয়া ও সঠিক আমল খুঁজছেন?

আমাদের প্যারেন্টিং ও আকিকা বিভাগে আজ আমরা শিখব, কালো টিপ বা তাবিজ নয়, বরং কুরআন-সুন্নাহর শক্তিশালী আমল দিয়ে কীভাবে শিশুকে বদনজর থেকে রক্ষা করবেন।

১. বদনজর থেকে বাঁচার শ্রেষ্ঠ দোয়া (মাসনুন আমল)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হাসান ও হোসাইন (রাঃ)-এর নিরাপত্তার জন্য এই দোয়াটি পড়ে তাদের গায়ে ফুঁ দিতেন। এটি শিশুদের সুরক্ষার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী দোয়া।

দোয়াটি হলো:

আরবি দোয়া أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لاَمَّةٍ
বাংলা উচ্চারণ উ’ইজুকুমা বি-কালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি, মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাতিন, ওয়া মিন কুল্লি ‘আইনিন লাম্মাহ।
বাংলা অর্থ আমি তোমাদের উভয়কে আল্লাহর পরিপূর্ণ কালামের আশ্রয়ে দিচ্ছি—যাবতীয় শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী ও বদনজর থেকে।

(রেফারেন্স: সহীহ বুখারী, হাদিস: ৩৩৭১)

আমল করার নিয়ম:

  • সকাল ও সন্ধ্যায় এই দোয়াটি ৩ বার পাঠ করে শিশুর শরীরে ফুঁ দিন।
  • যদি একটি শিশু হয় তবে ‘উ’ইজুকুমা’ (তোমাদের দুজনকে)-এর পরিবর্তে ‘উ’ইজুকা’ (ছেলে হলে) বা ‘উ’ইজুকি’ (মেয়ে হলে) বলবেন।

২. তিন কুল (৩টি সূরা) পড়ার আমল

বদনজর, জাদুটোনা এবং শয়তানের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য কুরআনের শেষ তিনটি সূরা (সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস) ঢালের মতো কাজ করে।

আমল করার নিয়ম: প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় এবং রাতে ঘুমানোর আগে বাবা বা মা নিজের দুই হাতের তালু একত্র করে এই ৩টি সূরা (কুল হুওয়াল্লাহ, কুল আউজু বিরাব্বিল ফালাক, কুল আউজু বিরাব্বিন নাস) পড়বেন। এরপর হাতে ফুঁ দিয়ে বাচ্চার মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুরো শরীর মুছে দেবেন। এটি বাচ্চার চারপাশে একটি অদৃশ্য সুরক্ষা বলয় তৈরি করে।

৩. মাশাআল্লাহ / বারাকাল্লাহ বলা

অনেক সময় নিজের বাবা-মায়ের নজরও সন্তানের ওপর লেগে যেতে পারে। অতিরিক্ত আদর বা মুগ্ধতা থেকে এটি হয়। তাই শিশুকে আদর করার সময় বা তার কোনো ভালো গুণ দেখলে সঙ্গে সঙ্গে “মাশাআল্লাহ” (আল্লাহ যা চেয়েছেন) বা “বারাকাল্লাহ” (আল্লাহ বরকত দিন) বলা উচিত। এতে বদনজর লাগে না।

অন্য কেউ আপনার বাচ্চার প্রশংসা করলে তাকেও “মাশাআল্লাহ” বলতে স্মরণ করিয়ে দিন।

বদনজর বা নজর লাগার লক্ষণ কী?

সব কান্না বা অসুস্থতা মানেই বদনজর নয়। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখে এটি বোঝা যেতে পারে: ১. শিশু অকারণে অনবরত কাঁদতে থাকা, যা থামছে না। ২. হঠাৎ করে দুধ পান করা বন্ধ করে দেওয়া বা খাবারে অরুচি। ৩. চিকিৎসায় ভালো হচ্ছে না এমন জ্বর বা শরীর গরম থাকা। ৪. শিশু হঠাৎ খুব খিটখিটে মেজাজের হয়ে যাওয়া।

এসব লক্ষণ দেখলে ডাক্তারি চিকিৎসার পাশাপাশি ওপরের দোয়াগুলো পড়ে ফুঁ দেওয়া বা রুকইয়াহ করা উচিত।

কালো টিপ বা সুতা কি নজর থেকে বাঁচায়?

আমাদের সমাজে একটি বহুল প্রচলিত কুসংস্কার হলো—বাচ্চার কপালে কালো টিপ দেওয়া বা হাতে-পায়ে কালো সুতা বাঁধা। অনেকে মনে করেন, কালো রঙ নজর কাটায়।

ইসলামি শরিয়ত মতে, এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা এবং শিরকের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাবিজ বা সুতা ঝোলাতে নিষেধ করেছেন। কালো টিপ বা লোহা কোনো ক্ষতি ঠেকাতে পারে না; কেবল আল্লাহর কালাম ও দোয়া-ই পারে শিশুকে রক্ষা করতে। তাই বাচ্চার কপালে কালো টিপ দিয়ে তার সুন্দর চেহারার সৌন্দর্য নষ্ট করবেন না এবং শিরক থেকে দূরে থাকুন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: আমি আরবি পড়তে পারি না, মোবাইলে অডিও চালিয়ে শোনালে কি কাজ হবে? উত্তর: অডিও শোনালে ঘরের পরিবেশ ভালো থাকে, কিন্তু বদনজর কাটানোর জন্য দোয়া পড়ে সরাসরি বাচ্চার গায়ে ফুঁ দেওয়া বা হাত বুলানো বেশি কার্যকর। বাংলা উচ্চারণ দেখে নিজে পড়ার চেষ্টা করুন।

প্রশ্ন ২: সূরা পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে কি খাওয়ানো যাবে? উত্তর: হ্যাঁ, যাবে। সূরা ফাতেহা, আয়াতুল কুরসি এবং তিন কুল পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে সেই পানি বাচ্চাকে পান করানো এবং গোসল করানো বদনজরের জন্য পরীক্ষিত চিকিৎসা (রুকইয়াহ)।

প্রশ্ন ৩: কতদিন পর্যন্ত এই আমল করতে হবে? উত্তর: এটি কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদের কোর্স নয়। শিশুদের সুরক্ষার জন্য প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় এই দোয়াগুলো পড়ার অভ্যাস করা উচিত। যেমন আমরা প্রতিদিন দরজা বন্ধ করি চোর থেকে বাঁচতে, তেমনি দোয়া পড়া উচিত শয়তান ও নজর থেকে বাঁচতে।

শিশুরা ফুলের মতো পবিত্র, তাই শয়তান ও হিংসুকদের নজর তাদের ওপর দ্রুত প্রভাব ফেলে। কুসংস্কারে বিশ্বাস না করে সুন্নাহ সম্মত উপায়ে শিশুর বদনজর থেকে বাঁচার দোয়া পড়ে তাদের সুরক্ষিত রাখুন। আল্লাহই একমাত্র হেফাজতকারী।

আপনার নবজাতকের জন্য ইসলামিক ও সুন্দর নাম খুঁজছেন? আমাদের সাহাবী ও কুরআনিক নাম বিভাগটি ঘুরে দেখার আমন্ত্রণ রইল।

Mijanur Rahman Hridoy
প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক

মিজানুর রহমান হৃদয়

ইসলামিক গবেষক ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। তিনি ইসলামি নাম কোষ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মুসলিম শিশুদের সুন্দর ও অর্থবহ নাম নির্বাচনে অভিভাবকদের সহযোগিতা করছেন। ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর তাঁর গভীর আগ্রহ রয়েছে।

Related Posts

আকিকার দোয়া ও নিয়ত: আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ (সঠিক নিয়ম)

আকিকার দোয়া ও নিয়ত: আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ (সঠিক নিয়ম)

ফ দিয়ে মেয়েদের ইসলামিক নাম: অর্থসহ ১৫০+ আধুনিক ও আনকমন তালিকা [২০২৬]

‘ফ’ দিয়ে মেয়েদের ইসলামিক নামের সেরা সংগ্রহ: অর্থসহ আধুনিক ও আনকমন তালিকা

ই দিয়ে ছেলেদের ইসলামিক নাম: অর্থসহ ৩০টি আধুনিক ও আনকমন নাম [তালিকা]

ই দিয়ে ছেলেদের ইসলামিক নাম: অর্থসহ ৩০টি আধুনিক ও আনকমন নাম (তালিকা)

Leave a Comment