সন্তান জন্মের পর বাবার করণীয়: আজান থেকে আকিকা পর্যন্ত ১০টি সুন্নাত (চেকলিস্ট)

সন্তান জন্মের পর বাবার করণীয়: একজন পুরুষের জীবনে ‘বাবা’ হওয়ার মুহূর্তটি সম্ভবত সবচেয়ে আনন্দদায়ক। কিন্তু আনন্দের পাশাপাশি এই সময় একজন বাবার কাঁধে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক দায়িত্বও চলে আসে। অনেকেই জানেন না সন্তান জন্মের ঠিক পরপর কী কী সুন্নাত পালন করতে হয়। কেউ কেউ শুধু আকিকা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, অথচ এর আগেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল রয়েছে।

সন্তান জন্মের পর বাবার করণীয়

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)

আজকের এই আর্টিকেলে আমরা সন্তান জন্মের পর বাবার করণীয় ১০টি সুন্নাত কাজ ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করব। নতুন বাবাদের জন্য এটি একটি চেকলিস্ট হিসেবে কাজ করবে।

১. আল্লাহর শুকরিয়া আদায় ও সুসংবাদ দেওয়া

সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে—এটি আল্লাহর দান। তাই প্রথম কাজ হলো আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা (আলহামদুলিল্লাহ বলা)। জাহেলি যুগে মেয়ে সন্তান হলে মন খারাপ করা হতো, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সন্তান হওয়ার খবর আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের জানানোও একটি সুন্নাত।

কেউ সুসংবাদ দিলে এই দোয়াটি পড়া সুন্নাত:

“বারাকাল্লাহু লাকা ফিল মাউহুবি লাক, ওয়া শাকারতাল ওয়াহিবা, ওয়া বালাগা আশুদ্দাহু, ওয়া রুযিকতা বিররাহু।” (অর্থ: আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তাতে বরকত দিন, তুমি দানকারীর শুকরিয়া আদায় করো, সন্তানটি পূর্ণ যৌবনে পৌঁছাক এবং তুমি তার সদ্ব্যবহার লাভ করো।)

২. ডান কানে আজান ও বাম কানে একামত

শিশুর জন্মের পরপরই (গোসল করানোর পর) তার ডান কানে আজান এবং বাম কানে একামত দেওয়া মুস্তাহাব। এর মাধ্যমে শিশুর কানে প্রথম আওয়াজ হিসেবে আল্লাহর বড়ত্বের ঘোষণা পৌঁছায়, যা শয়তানের প্রভাব থেকে তাকে রক্ষা করে।

নিয়ম: উচ্চস্বরে নয়, বরং সহনশীল ও মৃদু আওয়াজে আজান ও একামত দিতে হয়।

৩. তাহনিক করা (মিষ্টি মুখ করানো)

তাহনিক (Tahnik) একটি অবহেলিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। খেজুর চিবিয়ে একদম নরম করে বা মধু দিয়ে নবজাতকের মুখের তালুতে মালিশ করাকে তাহনিক বলে।

উপকারিতা: এটি শিশুর চোষার ক্ষমতা বাড়ায় এবং গ্লুকোজের ঘাটতি পূরণ করে। কোনো নেককার আলেম বা বুজুর্গ ব্যক্তিকে দিয়ে তাহনিক করানো উত্তম।

৪. সপ্তম দিনে সুন্দর নাম রাখা

সন্তান জন্মের ৭ম দিনে তার একটি অর্থবহ ও সুন্দর ইসলামিক নাম রাখা বাবার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কেয়ামতের দিন মানুষকে তার এবং তার বাবার নাম ধরে ডাকা হবে। তাই অনর্থক বা বিজাতীয় নাম এড়িয়ে চলুন। (সুন্দর নামের জন্য আমাদের সাহাবী ও কুরআনিক নাম ক্যাটাগরি দেখতে পারেন)

৫. আকিকা করা

৭ম দিনে আকিকা করা সুন্নাত। ছেলের জন্য ২টি এবং মেয়ের জন্য ১টি ছাগল বা ভেড়া জবেহ করতে হয়। এটি সন্তানের বালা-মুসিবত দূর করে। (বিস্তারিত জানুন: আকিকা করার সঠিক নিয়ম)

৬. মাথা মুণ্ডন ও সদকা করা

৭ম দিনে আকিকার পাশাপাশি শিশুর মাথার চুল কামানো এবং সেই চুলের ওজনের সমপরিমাণ রূপা বা তার মূল্য সদকা করা সুন্নাত। এটি শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। (বিস্তারিত জানুন: নবজাতকের চুল কামানো ও রূপা সদকা করার নিয়ম)

৭. খৎনা করানো (ছেলেদের জন্য)

ছেলে সন্তান হলে তাকে খৎনা (Circumcision) করানো ইসলামের শিআর বা প্রতীক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, শিশু বয়সে খৎনা করালে তা দ্রুত শুকায় এবং ইনফেকশনের ঝুঁকি কমে। বালেগ হওয়ার আগেই এটি সম্পন্ন করা বাবার দায়িত্ব।

৮. বদনজর থেকে সুরক্ষার দোয়া পড়া

শিশুদের ওপর বদনজর (Evil Eye) খুব দ্রুত প্রভাব ফেলে। তাই বাবার উচিত সকাল-সন্ধ্যায় শিশুকে কোলে নিয়ে সুরক্ষার দোয়া পড়া।

দোয়া:

“উইজুকুমা বি-কালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাতিন, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাহ।” (অর্থ: আমি তোমাদের উভয়কে আল্লাহর পরিপূর্ণ কালামের আশ্রয়ে দিচ্ছি—যাবতীয় শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী ও বদনজর থেকে।) – (বুখারী: ৩৩৭১)

৯. ভবিষ্যৎ গড়ার নিয়ত ও সম্পদ সঞ্চয়

বাবা হিসেবে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য হালাল রিজিকের ব্যবস্থা করা এবং তাকে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা এখন থেকেই শুরু করতে হবে। সন্তানের জন্য সঞ্চয় করাও ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয়।

১০. মায়ের যত্ন নেওয়া ও সঙ্গ দেওয়া

সন্তান জন্মের পর মা শারীরিকভাবে খুব দুর্বল থাকেন। এ সময় স্ত্রীর সেবা করা, তাকে মানসিক সাপোর্ট দেওয়া এবং গৃহস্থালির কাজে সাহায্য করা একজন আদর্শ স্বামী ও বাবার দায়িত্ব।

সন্তান আল্লাহ তায়ালার এক বিশাল আমানত। কেবল জন্ম দিয়েই বাবার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য যোগ্য করে গড়ে তোলাই আসল সার্থকতা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই ১০টি সুন্নাত যথাযথভাবে পালন করার তৌফিক দিন। আমিন।

আরও পড়ুনবদরি সাহাবীদের নামের তালিকা: ৩১৩ জন সাহাবীর বরকতময় নাম ও অর্থ (সেরা কালেকশন)

Mijanur Rahman Hridoy
প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক

মিজানুর রহমান হৃদয়

ইসলামিক গবেষক ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। তিনি ইসলামি নাম কোষ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মুসলিম শিশুদের সুন্দর ও অর্থবহ নাম নির্বাচনে অভিভাবকদের সহযোগিতা করছেন। ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর তাঁর গভীর আগ্রহ রয়েছে।

Related Posts

আকিকার দোয়া ও নিয়ত: আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ (সঠিক নিয়ম)

আকিকার দোয়া ও নিয়ত: আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ (সঠিক নিয়ম)

ফ দিয়ে মেয়েদের ইসলামিক নাম: অর্থসহ ১৫০+ আধুনিক ও আনকমন তালিকা [২০২৬]

‘ফ’ দিয়ে মেয়েদের ইসলামিক নামের সেরা সংগ্রহ: অর্থসহ আধুনিক ও আনকমন তালিকা

ই দিয়ে ছেলেদের ইসলামিক নাম: অর্থসহ ৩০টি আধুনিক ও আনকমন নাম [তালিকা]

ই দিয়ে ছেলেদের ইসলামিক নাম: অর্থসহ ৩০টি আধুনিক ও আনকমন নাম (তালিকা)

Leave a Comment